
এম এম এ রেজা পহেল, ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় হাওরের দেশি প্রজাতির মাছের সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। একসময় হাওর, বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে অনেক প্রজাতিই বিলুপ্তির পথে। বাজারেও আগের মতো সহজে মিলছে না দেশি মাছ। পাওয়া গেলেও দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
‘মাছের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে একসময় চিতল, মহাশোল, বাইম, রাণী, বাচা, শোল, গজার, টাকি, কৈসহ নানা প্রজাতির মাছ মানুষের খাবারের তালিকায় নিয়মিত ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। দেশি মাছের সংকটের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই বাজার থেকে পাঙাশসহ চাষের মাছ কিনে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাওর-বিল ইজারা নিয়ে মাছ আহরণের সময় কোথাও কোথাও পানি কমিয়ে বা জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা হয়। আবার বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ নিধনের অভিযোগও রয়েছে। এতে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ একসঙ্গে ধরা পড়ায় পরবর্তী মৌসুমে মাছের বংশবিস্তারের সুযোগ কমে যাচ্ছে। পোনা মাছও রেহাই পাচ্ছে না।
জেলেরা বলছেন, মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশি মাছের সংকট আরও তীব্র হবে।
বিশেষ করে চায়না দুয়ারি, খনা জাল, বাইড়, কুটি জালসহ বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে বড় মাছের পাশাপাশি ছোট মাছের পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী আটকা পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে শুধু ক্ষতিকর জাল নিষিদ্ধ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষতিকর জাল বন্ধের পাশাপাশি প্রকৃত জেলেদের বিকল্প আয়ের সুযোগ এবং আইনসম্মতভাবে মাছ ধরার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে।
এদিকে হাওরে বোরো ফসল রক্ষায় প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। কৃষকের ফসল রক্ষায় এসব বাঁধ গুরুত্বপূর্ণ হলেও অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ, খাল-বিলের স্বাভাবিক পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বৃষ্টির পানিতে বাঁধের মাটি ধুয়ে নদী-হাওরে পড়ায় কোথাও কোথাও জলাশয়ের নাব্যতা ও পানি ধারণক্ষমতা কমছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এর ফলে বর্ষায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মাছের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ক্রেতারা জানান, আগে বাজারে তুলনামূলক কম দামে দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন দেশি মাছ কিনতে গেলে অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। আগে যে মাছ ১০০ টাকায় কেনা যেত, এখন একই মাছ কিনতে ২৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের নিয়মিত দেশি মাছ খাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
টগার হাওরের জেলে সালাম মিয়া বলেন, “এখন আগের মতো জালে মাছ ওঠে না। সারারাত জাল টেনেও জনপ্রতি ৫০০ টাকার মাছ বিক্রি করতে পারছি না। সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।”
মোহনগঞ্জ আড়তদার সমিতির রতন পাঠান বলেন, “আগে মোহনগঞ্জের এই আড়তে তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও ধর্মপাশার হাওর থেকে প্রতিদিন সকাল-বিকেল কোটি কোটি টাকার মাছ আসত। এখন শুধু নামমাত্র মাছ আসে।”
সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মাদ শরীফুল হক আকন্দ বলেন, দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার কারণ একাধিক। এর মধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কৃষিতে কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা না মেনে রাসায়নিক সার ও বিষের ব্যবহার, খনা জাল, চায়না দুয়ারি, বাইড়, কুটি জাল ব্যবহার, অতিরিক্ত মাছ আহরণ এবং মা মাছ নিধনের কারণে মাছের প্রজনন নষ্ট হচ্ছে। জনবল সংকটের কারণে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকেও পুরোপুরি সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।



















