
এম এম এ রেজা পহেল
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে বৈরী আবহাওয়া, আগাম বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে বোরো ধান ঘরে তুলেছিলেন কৃষকরা। তবে ফসল ঘরে তোলার পর এবার নতুন সংকটে পড়েছেন তারা। বিশেষ করে কালো রঙ ধারণ করা ধান কিনতে চাইছেন না স্থানীয় আড়তদাররা। ফলে কম দামেও ধান বিক্রি করতে পারছেন না অনেক কৃষক।
কৃষকদের অভিযোগ, ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এর সঙ্গে ধান মাড়াই, পরিবহন ও শুকানোর খরচ যুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে শুকনো ধানের উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে মণপ্রতি আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ স্থানীয় বাজারে ভালো মানের ধানও বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মণ দরে।
আর ধানের রং কালো হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। আড়তদাররা এ ধরনের ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
কৃষকদের ভাষ্য, ধান কাটার পর বৃষ্টির কারণে সময়মতো ধান শুকানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘসময় ভেজা অবস্থায় থাকায় অনেক ধানের রং কালো হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, ধান বিক্রি করাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের কাছে ধান শুধু একটি ফসল নয়; এটি তাদের সারা বছরের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু গত বোরো মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেই আয়ের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বোরো ধান ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। জলাবদ্ধতা ও আগাম বন্যার আশঙ্কায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। কোনো কোনো কৃষক বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তোলেন। আর যারা কোনোভাবে ধান ঘরে তুলেছেন, এখন তাদের সামনে নতুন প্রশ্ন—ধান সংরক্ষণ করবেন, নাকি লোকসানে বিক্রি করবেন?
কৃষকদের হিসাবে, ধান কাটার সময় একজন শ্রমিককে দিতে হয়েছে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। এরপর মাড়াই, পরিবহন, শুকানোসহ বিভিন্ন খরচ যোগ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে।
অনেক কৃষক ধান কাটার পরপরই বিক্রি না করে ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় শুকিয়ে মজুত করে রেখেছিলেন। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না বাড়ায় এখন সেই মজুত ধানই তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধান সংরক্ষণে নিরাপদ জায়গার পাশাপাশি পোকামাকড় ও আর্দ্রতা থেকে ফসল রক্ষার বাড়তি ঝামেলাও রয়েছে। অন্যদিকে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে কৃষকের হাতে নগদ অর্থের প্রয়োজন।
পাইকুরাটি ইউনিয়নের টগা হাওরের কৃষক মির্জা রেজাউল করিম রেজু বলেন, “ধান ফলাইতে এবং শুকাইয়া ঘরে তুলতে খরচ হইছে ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ। বেশি লাভের আশায় মজুত রাখছিলাম। আর এহন এই ধান কালো রং হওয়ায় বিক্রি করতে পারতেছি না।”
ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসায়াদ বিন খলিল রাহাত বলেন, “সরকারি বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বাজারে ধানের দাম কম। এতে কৃষকের কষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া ধানের রং কালো হওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সময়মতো রোদ না পাওয়ায় এ রকম হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এছাড়া কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে ধানের দাম বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, “হঠাৎ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এমনটা হয়েছে। কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। সামনে বোরো মৌসুমে বীজসহ আরও প্রণোদনা দেওয়া হবে। কালো ধান বিক্রি করতে না পারার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হবে।”
এদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি ধান সংগ্রহমূল্য মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণের তথ্য রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষক যদি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন, তাহলে সরকারি ঘোষিত সংগ্রহমূল্যের সুবিধা প্রকৃতপক্ষে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি কালো রঙের ধান কেনার বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে তারা বড় ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পাবেন।



















