ডেস্ক রিপোর্টঃ আইসিইউ, ভেন্টিলেটর কিংবা হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে হামের বিস্তার ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়। সময়মতো কার্যকর টিকাদানই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
বুধবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ‘হামের বিস্তার ও জিনগত নজরদারি’ শীর্ষক কর্মশালা ও গবেষণা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ এবং আইসিডিডিআর,বির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের সাম্প্রতিক বিস্তার ও এর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের টিকাদান কর্মসূচিতে সময়মতো উদ্যোগের ঘাটতি ও নীতিগত গাফিলতির কারণে জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শুধু হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়িয়ে এ সংকট মোকাবিলা করা যাবে না।
তিনি বলেন, “হাজারটা ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ বেড বসিয়ে এই মৃত্যুর ঢল থামানো যাবে না। প্রতিরোধ এবং টিকাদানই এর একমাত্র সমাধান।”
হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অবাস্তব আশ্বাস দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, টিকাদানের গতি শতভাগ বাড়ানো গেলেও প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে। তবে এ সময়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
বিভাগীয় শহরে শিশু হাসপাতাল
শিশু স্বাস্থ্যসেবা রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী অক্টোবরের মধ্যেই দেশের পাঁচটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে নবনির্মিত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল আনুষ্ঠানিকভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করবে।
তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে দেশের প্রতিটি ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু স্বাস্থ্য, মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনি—এই চারটি মৌলিক বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে বড় পরিসরে জনবল নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান ডা. এম এ মুহিত।
তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে খুব দ্রুত এক লাখ নতুন স্বাস্থ্য মাঠকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় শিগগিরই পাঁচ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টও নিয়োগ দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য খাতের জনবল কাঠামোকে ভারসাম্যপূর্ণ বা ‘পিরামিড শেপ’-এ নিয়ে যেতে চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অনুপাত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
ঢাকার বাইরে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, বারডেম ও হলি ফ্যামিলির মতো স্বায়ত্তশাসিত কিন্তু সরকার-সমর্থিত ব্যবস্থাপনা মডেল স্বাস্থ্য খাতের জন্য কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ। ঢাকার বাইরে পর্যাপ্ত বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা না থাকায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীদের রাজধানীমুখী হতে হচ্ছে। এটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা।
তিনি বলেন, ঢাকার বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে যে ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা রয়েছে, পর্যায়ক্রমে একই মানের সেবা দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গড়ে তোলা হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মো. নুরুল ইসলাম এবং আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক।
গবেষণার মূল ফলাফল ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান বিজ্ঞানী ড. মুস্তাফিজুর রহমান।
নতুন কোনো ভাইরাস নয়, হামের বিস্তারের নেপথ্যে B3
গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৬ সালে দেশে ছড়িয়ে পড়া হামের পেছনে ভাইরাসের নতুন কোনো ধরন দায়ী নয়। বিশ্বজুড়ে প্রচলিত তীব্র সংক্রামক ‘B3’ ধরনের ভাইরাসের বিস্তার, টিকাদানে ঘাটতি এবং মাতৃদুগ্ধ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির স্বল্পতাই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
বিশেষ করে নয় মাস বয়সের আগেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়া এবং নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতির কারণে ছয় থেকে নয় মাস বয়সী অপুষ্ট শিশুরা হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।








