

একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সমৃদ্ধি ও সৌন্দর্য নির্ভর করে তার মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর। আর এসব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনীতি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের আস্থা ও দায়িত্বের জায়গা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া মানে মানুষের সেবা করার একটি বড় সুযোগ পাওয়া। তাই একজন রাজনীতিবিদের প্রথম ও প্রধান গুণ হওয়া উচিত সততা। জনগণের আমানতকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করে দেশের কল্যাণে কাজে লাগানোর মানসিকতা থাকতে হবে।
রাজনীতিতে নৈতিকতা ও আদর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। ক্ষমতা পরিবর্তনশীল, পদও চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু একজন মানুষের কর্ম ও চরিত্রের ইতিহাস দীর্ঘদিন মানুষের মনে থেকে যায়। তাই সাময়িক রাজনৈতিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হওয়া উচিত একজন দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদের পরিচয়।
একজন প্রকৃত জননেতার মধ্যে থাকতে হবে জবাবদিহির সাহস। নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া, ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটি দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের সম্পদ—এই উপলব্ধি রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
রাজনীতিতে সহনশীলতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা অত্যন্ত জরুরি। গণতন্ত্র মানে সবাই একই কথা বলবে—এমন নয়। বরং ভিন্ন মত, ভিন্ন চিন্তা ও ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের সহাবস্থানই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
একজন রাজনীতিবিদকে শুধু বক্তৃতায় নয়, কাজের মাধ্যমেও মানুষের পাশে থাকতে হবে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে হবে, সাধারণ মানুষের কথা শুনতে হবে এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। নির্বাচন এলেই মানুষের দরজায় কড়া নাড়া নয়, সারা বছর মানুষের পাশে থাকার রাজনীতিই হওয়া উচিত আদর্শ রাজনীতি।
দেশ পরিচালনায় প্রয়োজন দূরদর্শী চিন্তা। আজকের জনপ্রিয়তার জন্য এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যার বোঝা আগামী প্রজন্মকে বহন করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও থাকতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রাজনীতিতে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান, দলীয় স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ এবং ক্ষমতার চেয়ে জনগণের কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বিভাজন ও সংকীর্ণ স্বার্থ সমাজকে পিছিয়ে দেয়। অন্যদিকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করে।
একটি সুন্দর দেশ গড়ার স্বপ্ন শুধু সরকারের নয়, প্রতিটি নাগরিকের। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণ ও সিদ্ধান্ত সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই রাজনীতিবিদদের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ, দূরদর্শিতা, সহনশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চর্চা শক্তিশালী হলে রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতির আসল সাফল্য ক্ষমতায় কতদিন থাকা নয়; মানুষের মনে কতটা আস্থা, সম্মান ও কল্যাণের স্মৃতি রেখে যাওয়া—সেটিই বড় কথা।
দেশের মানুষ এমন রাজনীতি চায়, যেখানে প্রতিশ্রুতির চেয়ে কাজ বড়, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে জনস্বার্থ বড় এবং ক্ষমতার চেয়ে মানুষের অধিকার বড়।
রাজনীতি হোক মানুষের জন্য—ক্ষমতার জন্য নয়। নেতৃত্ব হোক সেবার প্রতিশ্রুতি—প্রভুত্বের নয়।
প্রকাশক ও সম্পাদক এ.এম.সারোয়ার জাহান
অফিস ঠিকানা: রোড ০৩, বাড়ি ২৩/১, বাসাবো, সবুজবাগ, ঢাকা ১২১৪
দেশবাংলা প্রতিদিন