
হাওর-নদীর বুকে বর্ষার জীবন
বর্ষাকাল হাওর ও নদীঘেরা গ্রামের মানুষের জীবনে এক বিশেষ ঋতু। বর্ষা এলেই চারপাশের মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর পানিতে ভরে যায়। বিস্তীর্ণ হাওর যেন এক বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। নদী, খাল ও বিলগুলো পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। তখন গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে পানির সঙ্গে মিশে যায়। বিশেষ করে আশির দশকের গ্রামীণ জীবনে বর্ষাকালে নৌকা ছিল মানুষের চলাচলের একমাত্র বাহন। নৌকা ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার কার্যত কোনো সুযোগ ছিল না।
বর্ষাকালে হাওরের চেহারা ছিল অপূর্ব। যতদূর চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। দূরে কোথাও কোনো গ্রামকে মনে হতো পানির বুকের ওপর ভাসমান একটি ছোট্ট দ্বীপ। হাওরের মাঝ দিয়ে নৌকা চলত, আর মাঝির বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ চারপাশের নীরবতা ভেঙে দিত।
বর্ষার বৃষ্টিতে নদী ও হাওরের পানি বাড়তে থাকত। গ্রামের কাঁচা রাস্তা, জমির আইল ও চলাচলের পথ পানির নিচে তলিয়ে যেত। ফলে স্থলপথে চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। মানুষ তখন নৌকার ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ত।
নৌকাই ছিল একমাত্র বাহন
বর্ষাকালে নৌকা ছাড়া গ্রামের মানুষ কোথাও যেতে পারত না। নৌকাই ছিল তাদের একমাত্র বাহন। ছোট ডিঙি নৌকা, মাঝারি আকারের নৌকা কিংবা যাত্রীবাহী নৌকা—প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের নৌকা ব্যবহার করা হতো।
বৃষ্টির দিনে মাথায় ছাতা থাকলেও অনেক সময় বৃষ্টির হাত থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়া যেত না। তবুও মানুষ নৌকায় চড়ে এপার থেকে ওপারে যেত। কখনো প্রচণ্ড বৃষ্টি, কখনো বাতাস, কখনো উত্তাল নদী—সবকিছুকে উপেক্ষা করেই মানুষের নৌযাত্রা চলত।
বর্ষাকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য গ্রামের মানুষ নৌকায় করে হাট-বাজারে যেত। কেউ ধান, মাছ, শাকসবজি বা গৃহস্থালির সামগ্রী নিয়ে বাজারে যেতেন, আবার কেউ বাজার থেকে চাল, লবণ, তেল, কাপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নৌকায় করে বাড়ি ফিরতেন।
বৃষ্টিতে ভিজে, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় বসে মানুষ বাজারে যেত। হাটের দিনগুলোতে নদী ও হাওরে অনেক নৌকার দেখা মিলত। দূর থেকে মনে হতো, পানির ওপর যেন নৌকার মেলা বসেছে।
বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের জীবনও ছিল কঠিন। স্কুল-কলেজে যাওয়ার জন্য অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন নৌকায় যাতায়াত করতে হতো। ভোরবেলা বই-খাতা নিয়ে নৌকায় উঠত তারা। বৃষ্টি হলে অনেক সময় বই-খাতা ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। তবুও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তারা নৌকায় করে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেত।
অনেক সময় নদীর ঢেউ, ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠত। তারপরও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তাদের এই কষ্ট সহ্য করার শক্তি জোগাত।
বর্ষাকালে অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসার জন্যও নৌকায় করে নিয়ে যেতে হতো। গ্রামের কাছাকাছি চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকলে দূরের বাজার বা উপজেলা সদরে যেতে হতো। কোনো রোগীকে নৌকায় শুইয়ে কিংবা বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যেত, কারণ নদীপথের ওপরই নির্ভর করতে হতো।
প্রচণ্ড বৃষ্টি বা রাতের অন্ধকারে অসুস্থ মানুষকে নৌকায় করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও নৌকাই ছিল ভরসা।
হাওর ও নদী শুধু মানুষের চলাচলের মাধ্যমই ছিল না; এগুলো ছিল তাদের জীবন ও জীবিকারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীতে মাছ ধরা, নৌকা চালানো, মাছ ও অন্যান্য পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া—সবকিছুই নদীকেন্দ্রিক ছিল।
বর্ষাকালে নদী যেমন মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠত, তেমনি কখনো কখনো দুর্ভোগের কারণও হতো। অতিরিক্ত পানিতে বাড়িঘর প্লাবিত হওয়া, প্রবল স্রোত, ঝড় ও নৌ-দুর্ঘটনার আশঙ্কা মানুষের জীবনে ভয় তৈরি করত।
হাওর ও নদীঘেরা গ্রামের মানুষের কাছে বর্ষাকাল ছিল প্রকৃতি, পানি ও নৌকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক জীবন। বিশেষ করে আশির দশকে যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সীমিত। বর্ষাকালে যখন রাস্তাঘাট পানির নিচে চলে যেত, তখন নৌকা ছাড়া মানুষের চলাচলের আর কোনো উপায় থাকত না। নৌকাই ছিল একমাত্র বাহন। বৃষ্টিতে ভিজে, কখনো ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মানুষ নৌকায় করে এপার থেকে ওপারে যেত—হাট-বাজারে, স্কুল-কলেজে, আত্মীয়ের বাড়িতে কিংবা চিকিৎসার জন্য। সেই সময়ের নৌকানির্ভর জীবন ছিল কষ্টকর, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল মানুষের সাহস, সংগ্রাম, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের এক অনন্য উদাহরণ।
প্রকাশক ও সম্পাদক এ.এম.সারোয়ার জাহান
অফিস ঠিকানা: রোড ০৩, বাড়ি ২৩/১, বাসাবো, সবুজবাগ, ঢাকা ১২১৪
দেশবাংলা প্রতিদিন