Monday , December 11 2017
সর্বশেষ সংবাদ :
Home / শিক্ষাঙ্গন / জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিদের কথা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিদের কথা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিদের কথা

রঙ-বেরঙের নানা প্রজাতির পাখির কলরবে মুখরিত দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পাখিপ্রেমী মানুষের স্বর্গ এই জাহাঙ্গীরনগরে ক্যাম্পাসবাসীর ঘুম ভাঙে পাখির কিচির মিচির শব্দে। ঘুম ভাঙার পর হলের রুমের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই হরেক প্রজাতির নাম জানা-অজানা পাখির দর্শনে মুগ্ধ হতে হয়। এ  দৃশ্য বছরের পর বছর দেখেও কখনও ক্লান্ত হয় না জাহাঙ্গীরনগরবাসী। তাই তো ছুটিতে নাড়ীর টানে বাড়ি গেলেও আবার ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য চোখে মেখে নিতে ফিরে আসার আকাংখায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

পাখিদের বিচরণ দেখে মনে হয় প্রতিদিনই তারা নিত্য-নতুন  উৎসবে মেতে ওঠে। ক্যাম্পাসে পাখি দেখার সবচেয়ে ভালো সময় সকাল ও বিকাল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচরণ করে এমন প্রজাতির পাখির সংখ্যা ১৯৭টি। এদের মধ্যে পরিযায়ী বা অতিথি পাখির প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৬৯টি, বাকী পাখিগুলো এ ক্যাম্পাসেরই স্থায়ী বাসিন্ধা।

নিয়মিত দেখতে পাওয়া পাখিগুলোর মাঝে ফিঙে, টিয়া, ডাহুক, বিভিন্ন প্রজাতির মাছরাঙ্গা, ঘুঘু, দলপিপি, ছোট পানকৌড়ি, দোয়েল, বুলবুলি, সাতভাই ছাতারে, চড়ুই, শালিক, কাঠঠোকরা, সুঁইচোরা উল্লেখযোগ্য।

টুনটুনি ও কোকিল পাখির শব্দে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হলেও এদের দেখতে হলে প্রয়োজন সামান্য মনোযোগের। টুনটুনি মূলত বিভিন্ন ঝোপঝাড়ে, কোকিল উঁচু ডালে বসে কুহুতানে ব্যস্ত থাকে। পেঁচার মধ্যে খুড়ূলে পেঁচার সংখ্যাই বেশি। জীববিজ্ঞান ও নতুন কলা অনুষদ এলাকায় এদের বেশি দেখা মেলে। সন্ধ্যা হলেই শহীদ মিনার এলাকায়ও এদের বিস্তর ওড়াওড়ি লক্ষ্য করা যায়। একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে লক্ষ্মী, খয়রা শিকড়ে, ভুতুম ও কণ্ঠী নিমপেঁচারও দেখা মেলে বছরের বিভিন্ন সময়ে। বিভিন্ন স্থানে গাছের ডালে কাঠঠোকরাদের দেখা মেলে। পাকড়া ও বাংলা কাঠঠোকরা সবচেয়ে বেশি পরিমানে দেখা যায়। সুঁইচোরা ক্যাম্পাসের সুন্দরতম পাখিদের মাঝে একটি। এদের দেখার জন্য প্রয়োজন সামান্য একটু পর্যবেক্ষণ। পুরাতন কলা, জিমনেশিয়াম, বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকায় এদের শিকাররত অবস্থায় দেখা যায়। টিয়াপাখিদের দেখা মেলে জীববিজ্ঞান অনুষদের পাশে। মজার ব্যাপার হল তাদের মধুময় শব্দে পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগের ব্যাঘাত পর্যন্ত ঘটে মাঝেমধ্যে। বিভিন্ন জলাশয়ের ধারে গাছের ডালে শিকার ধরার অপেক্ষায় থাকা মাছরাঙ্গাদের দেখা পাওয়া যায়। পাকড়া, খয়রাপাখা, মেঘহও মাছরাঙ্গা সচরাচর দেখা না গেলেও ধলাগলা, ছোট মাছরাঙ্গার দেখা মেলে সর্বত্র। শালিক ও বুলবুলি ক্যাম্পাসে সবচেয়ে বেশি পরিমানে দেখা যায়। আরও যে পাখিটি বেশি দেখা যায় তার নাম সাতভাই ছাতারে। সারাদিনই এরা ঝগড়াঝাটিতে লিপ্ত থাকে। শালিকের প্রজাতিগুলোর মাঝে গো, ভাত, ঝুটি ও কাঠ শালিকেরই দেখা মেলে সবচেয়ে বেশি। আর পানকৌড়িরা বসে থাকে বিভিন্ন জলাশয়ে ধারে গাছের ডালের উপর পাখা মেলে।

এছাড়া জালালি কবুতর, ডাহুক, জলমুরগী, বিভিন্ন প্রজাতির চিল ও বাজ, কানিবক সারাবছর ক্যাম্পাসে দেখা যায়। বছরের বিভিন্ন সময়ে কানাকুয়া, হুদহুদ, সাহেলি, ফটিকজল, কসাই পাখি, ভরতপাখি, বিভিন্ন প্রজাতির মুনিয়া, ছাপাখি, প্রিনিয়া, বাবুই, ছুটকি, খঞ্জনা দেখা যায়। আর নীলকণ্ঠ, হলদে-পা হড়িয়াল, বৌ-কথা-কও, বিভিন্ন প্রজাতির ঈগল পাখির দেখা মেলা একটু কষ্টসাধ্য।

শীত এলেই প্রকৃতির উৎসবে যোগ দিতে ঐতিহ্যগতভাবে জাহাঙ্গীরনগরের আতিথ্য গ্রহণ করে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি। শীত বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে তাদের আগমন। ক্যাম্পাসের লেকগুলো জুড়ে হাজার হাজার লাল শাপলাদের মাঝে পাখিদের ওড়াওড়ি জুড়িয়ে দেয় এ ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের প্রাণ। এ পাখিগুলোর বেশিরভাগই জলচর তথা হাঁস প্রজাতির এবং এদের মাঝে ৯৫ শতাংশ পাতি সরালি। পাতি সরালিকে অনেকে অতিথি/পরিযায়ী পাখি বললেও এই প্রজাতিটি আসলে আমাদের দেশীয় পাখি যা অন্যান্য অঞ্চলে সারা বছরই কমবেশি দেখা যায়।

পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ প্রতিবছর আয়োজন করে ‘পাখিমেলা’। শীতের পাখিদের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ক্যাম্পাসে ঢোল বাজানো, পটকা ফুটানো ও গাড়ির হর্ন বাজানো প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শখের আলোকচিত্রীদের জন্য স্বর্গরাজ্য এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। যুগে যুগে প্রকৃতিপ্রেমীদের কখনই আশাহত করেনি মনোমুগ্ধকর জাহাঙ্গীরনগর। একটি বিষয় দুঃখজনক যে প্রতিবছর শীতের পাখিদের নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হলেও নিয়মিত পাখিগুলো, যেগুলো ক্যাম্পাসবাসীকে সারাবছরই কলকাকলিতে মুখরিত করে রাখে তাদের নিয়ে লেখালেখি হয় না। দক্ষ শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো সুন্দর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে বাহারি রঙে আরও রঙিন করে তোলা এ পাখিদের সুরক্ষায় জনসচেতনতা তৈরির দায়িত্ব আমাদেরই।

লেখক: ইখতিয়ার আহমেদ বাপ্পী, ইংরেজি বিভাগ, ৩য় বর্ষ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*