Monday , December 11 2017
সর্বশেষ সংবাদ :
Home / সারাদেশ / চিকুনগুনিয়া: বর্তমান অবস্থা ও আমাদের করণীয়
চিকুনগুনিয়া: বর্তমান অবস্থা ও আমাদের করণীয়

চিকুনগুনিয়া: বর্তমান অবস্থা ও আমাদের করণীয়

চিকুনগুনিয়া কী? চিকুনগুনিয়া (Chikungunya) হচ্ছে মশাবাহিত একটি ভাইরাসজনিত রোগ। চিকুনগুনিয়া ভাইরাস টোগা ভাইরাস গোত্রের, মশাবাহিত হওয়ার কারণে একে আরবো ভাইরাসও বলে। মানুষ ছাড়াও বানর, পাখি  তীক্ষ্ন দন্ত প্রাণী যেমন ইঁদুরে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১৯৫২ সালে প্রথম তানজানিয়াতে এ রোগটি ধরা পড়ে। চিকনগুনিয়া নামটি এসেছে তানজানিয়ার মাকুন্দি জনগোষ্ঠির ব্যবহৃত কিমাকুন্দি ভাষা  থেকে যার অর্থ ”বাঁকা হয়ে যাওয়া” বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকে এটাকে লেংড়া জ্বর নামেও বলে থাকে।

যদিও চিকুনগুনির প্রাদুর্ভাব সাধারণত এশিয়া ও আফ্রিকাতেই বেশি দেখা যায় তবে প্রতিবেদন অনুসারে ২০০০-এর দশকে এটি ইউরোপ ও আমেরিকাতে ছড়িয়ে পড়েছিল। এক মিলিয়নের বেশি মানুষ আক্রন্ত হয়েছে ২০১৪ সালে । ২০১৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতে দেখা গেছে । ২০০৮ সালে বাংলাদেশের রাজশাহী এবং চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলায় প্রথম এ রোগটি ধরা পরে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে ঢাকার দোহারে এটি লক্ষ্য করা গেলেও এরপর তেমনভাবে এ ভাইরাসের কথা শোনা যায় নি।  ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে বর্তমানে সারাদেশে এ রোগটি উল্লেখযোগ্য হারে লক্ষ করা যাচ্ছে।

জ্বরের লক্ষণ সমূহ:  ১০২-১০৪°ফা  জ্বর আসা সঙ্গে প্রচণ্ড গিঁটে গিঁটে ব্যথা,  প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শরীরে ঠাণ্ডা অনুভূতি (Chill), বমি বমি ভাব অথবা বমি, গায়ে লালচে দানা, মাংসপেশিতে বা অস্থিসন্ধিতে  ব্যথা। কখনও কখনও অস্থিসন্ধির ব্যথা কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছরের বেশি সময় থাকতে পারে। ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাস ও একই মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং প্রায় একই রকম রোগের লক্ষণ দেখা যায়।

চিকুনগুনিয়ার বাহক: এডিস ইজিপ্টি ((Ades aegypti) এবং এডিস এলবোপিকটাস (Ades albopictus) মশার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়।এমশাগুলোর শরীরের ও পায়ের সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ দেখে সহজেই চেনা যায়। এদেরকে টাইগার মশাও বলা হয়ে থাকে। এ মশাগুলো সাধারণত পরিষ্কার বদ্ধ পানিতে জন্মায় এবং যাদের আশপাশে এ রকম মশা বংশবৃদ্ধির জায়গা আছে, সে সব লোকজন বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

কীভাবে ছড়ায়: এ রোগটি চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে বহনকারী এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।মশা কামড়ের ৩-৭ দিন (তবে কোন কোন ক্ষেত্রে ২-২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে) পরে এ জ্বর হতে থাকে। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায়। এছাড়াও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস আক্রান্ত রক্তদাতার রক্ত গ্রহণ করলে এবং ল্যাবরেটরীতে নমুনা পরীক্ষার সময়ে অসাবধানতায় এ রোগ ছড়াতে পারে।

 এরোগ থেকে বাচঁতে আমাদের করনীয়: চিকুনগুনিয়ার কোনো টিকা নাই। জনসচেতনতাই এ রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।

মশার কামড় থেকে সুরক্ষা: মশার কামড় থেকে নিজেকে ও পরিবারের লোকজনকে রক্ষা করাই চিকুনগুনিয়া থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায়। শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢাকা রাখা (ফুল হাতা শার্ট এবং ফুল প্যান্ট পরা), মশা যাতে ঘরে ঢুকতে না পারে সে ব্যবস্থা করা, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা, শরীরে মশা বিকর্ষি ক্রিম ব্যবহার করার মাধ্যমে মশার কামড় থেকে বাঁচা যায়। এছাড়াও এরোসল বা কয়েল ব্যাবহার করে ঘরের পূনাঙ্গ মশা মেরে ফেলা বা তাড়িয়ে দেয়া যায়।

মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা: এডিস মশা বাসা ও তার আশপাশে জমে থাকা পানিতে ডিম পারে। তাই নিজেদের বাসা ও তার আশপাশে মশার প্রজনন স্থান ধ্বংস করতে হবে। বাসার আশপাশে ফেলে রাখা পাত্র, কলসী, বালতি, ড্রাম, ইত্যাদি যেসব জায়গায় পানি জমতে পারে, সেখানে এডিস মশা প্রজনন করতে পারে।নির্মানাধীন বাড়ির চৌবাচ্চা, ড্রামে ঢাকা শহরের সবচেয়ে বেশী এডিস মশা পাওয়া যায়। এসব স্থানে যেন পানি জমতে না পারে সে ব্যাপারে লক্ষ রাখা এবং নিয়মিত পরিষ্কার করা। সরকারের সচেতনতা মূলক মশা নিধন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা। যেহেতু এ মশা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত থেকে ভাইরাস নিয়ে অন্য সুস্থ মানুষকে আক্রান্ত করে, কাজেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে যাতে মশা কামড়াতে না পারে সেজন্য রোগীকে অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে। কারণ- আক্রান্ত রোগীকে কামড় দিয়ে, পরবর্তীতে কোনো সুস্থ লোককে সেই মশা কামড় দিলে ওই ব্যক্তিও এ রোগে আক্রান্ত হবেন।

সরকারী সংস্থার করনীয়: মশা নিয়ন্ত্রনের সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর যথাযত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারী সংস্থা যেমন সিটি করপোরেশন, পৌরসভায় মশা নিয়ন্ত্রণ সেল থাকতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য মাষ্টার প্লান তৈরি করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল এন্টোমোলোজিষ্ট নিয়োগ দিতে হবে। নিয়মিত মশার প্রজাতি ও ঘনত্ব পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী্ মশার প্রজাতি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা করলে জাতি উপকৃত হবে। সমন্বনিত মশক ব্যবস্থপনার মাধ্যমে মশা দমনের কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। মশার নিয়ন্ত্রনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখে,  এবং হয়ে থাকলে তা পরিবর্তন করে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী্ নতুন কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। রোগ শুরু হবার পরে নয় আগে থেকে সতর্ক হলে মশা বাহিত রোগ থেকে জনগনকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

চিকিৎসা: চিকুনগুনিয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রাম নিতে হবে, প্রচুর পানি ও তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে এবং প্রয়োজনে জ্বর ও ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল জাতিয় ট্যাবলেট এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে ওষুধ খেতে হবে। তবে অন্যকোন জ্বরকে চিকুনগুনিয়া ভেবে ভুল চিকিৎসা যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গিটের ব্যথার জন্য গিঁটের উপরে ঠাণ্ডা পানির স্যাঁক এবং হালকা ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। তবে জ্বর ভাল হবার পরও যদি গিঁটের ব্যথা ভালো না হয়, তবে  চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মশানিয়ন্ত্রণ সরকারী সংস্থাকে দোষারোপ না করে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিয়ে নিয়ন্ত্রন করতে হবে। সাথে সাথে সরকারী সংস্থাগুলোকেও আরো দায়িত্বশীল ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: ড. কবিরুল বাশার, অধ্যাপক (কীটতত্ত্ব), প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*