Monday , December 11 2017
সর্বশেষ সংবাদ :
Home / সারাদেশ / মনোলোভা ফুল কৃষ্ণচূড়া
মনোলোভা ফুল কৃষ্ণচূড়া

মনোলোভা ফুল কৃষ্ণচূড়া

সনজিৎ সরকার উজ্জ্বল: কৃষ্ণচূড়া গাছের  আরেক নাম যে গুলমোহর তা কম লোকই জানেন, কিন্তু কৃষ্ণচূড়াকে চেনেন না এমন লোক খোঁজে পাওয়া ভার। এখন কৃষ্ণচূড়ার সময়, ফুল ফোটে আছে গাছে গাছে লালে লাল হয়ে। এই লালের সমারোহ কৃষ্ণচূড়ারই মহিমা।

আমাদের দেশে কৃষ্ণচূড়া ফোটে এপ্রিল থেকে জুন মাসে । কিন্তু দুনিয়ার অন্য প্রান্তের কৃষ্ণচূড়া আমাদের সময়ের সাথে মিল রেখে ফোটে না, বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে কৃষ্ণচূড়াকে  ফোটতে দেখা যায়। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডায় ফোটে জুন মাসে আবার ক্যারাবিয়ান অঞ্চলে ফোটে মে থেকে সেপ্টেম্বরে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় ফোটতে দেখা যায় ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, কিন্তু আরব আমিরাতে ফুল ফোটতে শুরু করে সেপ্টেম্বরে। কৃষ্ণচূড়া বা রাধাচূড়া কোনোটিই আমাদের দেশীয় ফুল গাছ নয়। কৃষ্ণচূড়ার আদি নিবাস পূর্ব আফ্রিকার মাদাগাস্কার, রাধাচূড়ার জন্ম ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর কনকচূড়ার জন্মস্থান শ্রীলঙ্কা বা অস্ট্রেলিয়া।

প্রকৃতির খেলা দেখুন, কিছুদিন আগে ফোটেছে রক্ত রাঙা পলাশ আর মান্দার। এদের দাপট শেষ হতে না হতেই এবার সেই লাল রংয়ের লালীমা নিয়ে হাজির হয়েছে কৃষ্ণচূড়া। অবশ্য কৃষ্ণচূড়া যে শুধু লাল রং এর হয় তা নয়, প্রধানত লাল হলেও কমলা লাল ও হলুদ রং এর হতে দেখা যায়। আসলে রাধাচূড়া হলুদ বা হলদে লাল হয় ঠিকই, কিন্তু কৃষ্ণচূড়ার সাথে এর প্রধান পার্থক্য হচ্ছে গাছের আকারের। কৃষ্ণচূড়া হয় বড় থেকে মাঝারি আকারের গাছ, আর রাধাচূড়া যাকে অনেক সময় বলা হয় ছোটো কৃষ্ণচূড়া সেটা হয় ছোটো আকারের গাছ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভিতরে রাস্তার পাশ দিয়ে এ‌ই রাধাচূড়ার গাছ লাগানো হয়েছে। গেলেই দেখতে পাবেন ছোট ছোট রাধাচূড়া গাছে কৃষ্ণচূড়ারই মতো দেখতে ফুল ফোটে আছে।

আবার কনকচূড়া নামের আরেকটি ফুল আছে যা দেখতে অনেকটাই রাধাচূড়ার মতই হলুদ রং এর। ফোটেও একই সময়ে আর গাছটিও প্রায় কৃষ্ণচূড়ার মতই দেখতে। অনেক লোকই এই কনকচূড়াকে রাধাচূড়া বলে ভুল করে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Peltophorum roxburghii.

কৃষ্ণচূড়া গাছের উজ্জ্বল সবুজ  ঝিরি ঝিরি পাতা একে দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য দান করেছে। শুধু মাত্র সৌন্দর্য নয় বরং এর নিবিড় ছায়া উষ্ণ আবহাওয়ায় অনাবিল প্রশান্তি প্রদান করে । গাছ যখন একটু বড় হয় তখন ডাল-পালা চারদিকে ছড়িয়ে দেয় মাটির দিকে মুখ করে।  আমাদের দেশে শীত-গ্রীষ্মে কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরে যায় অনেকটাই।  প্রায় পত্রহীন গাছে গাছে বড় বড় থোকায় থোকায় ঝাপটে আসে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল। দূর থকে দেখা যায় শুধুই লালের লীলা, অল্প যা কিছু পাতা থাকে তা লজ্জায় লাল হয়ে মিলিয়ে যায় লালের সঙ্গেই। এমন আবেশে প্রেমিক হৃদয় আকুল হয়ে গেয়ে উঠে কৃষ্ণচূড়া লাল হয়েছে ফুলে ফুলে তুমি আসবে বলে।

কৃষ্ণচূড়া ফুলে চার থেকে পাঁচটি পাপড়ি যুক্ত। পাপড়ি গুলো প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৭ সেন্টিমিটারের মতো চওড়া হতে হয়। পাঁপড়িগুলি এমন ভাবে মেলে থাকে মনে হয় যেন বাঘের থাবা। সম্ভবত এ জন্যই কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম হয়েছে  Delonix regia. Delonix শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ delos আর onux থেকে। যার আক্ষরিক অর্থ স্পষ্ট দৃশ্যমান থাবা। regis শব্দের অর্থ royal, তাই কৃষ্ণচূড়াকে রাজকীয় গাছ বলতে পারেন। কৃষ্ণচূড়ার অনেক গুলি ইংরেজী নাম রয়েছে- royal poinciana, flamboyant tree, flame tree, peacock flower ইত্যাদি। অনেকে মনে করেন, পৃথিবীর সবচেয়ে রঙ্গিন গাছ এই কৃষ্ণচূড়া। গ্রীষ্মে লাল রং এর ফুলে প্রায় নিষ্পত্র গাছ আচ্ছন্ন হয়ে গেলেও বর্ষা পর্যন্ত গাছে ফুলের রেশ থাকে। কৃষ্ণচূড়া গাছ যৌগিক পত্র বিশিষ্ট এবং উজ্জ্বল সবুজ। প্রতিটি পাতা ৩০-৫০ সে.মি. লম্বা এবং ২০-৪০ টি উপপত্র বিশিষ্ট। ফল শিমের মত চ্যাপ্টা ৩০-৬০ সে.মি. লম্বা। বীজ থেকে সহজেই চারা জন্মে। চারাগুলি দ্রুত বাড়ে আর কয়েক বছরের মধ্যেই সে গাছে ফুল আসে। কৃষ্ণচূড়া গাছ অনেকটা যায়গা নিয়ে লাগানো উচিত। আর সবচেয়ে সুন্দর হয় যদি কৃষ্ণচূড়ার কাছাকাছিই এমন গাছ লাগানো যায় যাতে হলুদ বা নীল রং এর ফুল ফোটে। যেমন বাধাচূড়া আর কনকচূড়া কিংবা জারুল।

কৃষ্ণচূড়া যখন জ্বলে উঠে এই প্রকৃতির বুকে তখন সব বাঙালির হৃদয়কেই দোল দেয়। বাংলার প্রকৃতিতে কৃষ্ণচূড়ার উপস্থিতি এত প্রবল যে সব গাছ, সব রংকে ম্লান করে কৃষ্ণচূড়া জেগে ওঠে অম্লান রূপ ও রসে।

রবি ঠাকুর বলেছেন; “গন্ধে উদাস হাওয়ার মত উড়ে তোমার উত্তরী, কর্ণে তোমার কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জুরী।”

এমন একটি রুপকথা প্রচলিত আছে যে , কালো কৃষ্ণচূড়া (মেয়ে) আর এক লাল গোলাপ (ছেলে) খুব ভাল বন্ধু ছিল । গোলাপ কৃষ্ণচূড়াকে ভালবাসে, কিন্তু কৃষ্ণচূড়া তা জানে না, সে ভালবাসে শিমুলকে। কিন্তু শিমুল নিজে লাল, তাই তার চাই লাল টুকটুকে বউ। সে কালো কৃষ্ণচূড়াকে চায় না। এই নিয়ে কৃষ্ণচূড়ার মনে খুব দুঃখ। এদিকে গোলাপ তার প্রিয়ার এই দুঃখ সহ্য করতে না পেরে একদিন তাকে সান্ত্বনা দিতে জড়িয়ে ধরল। যখন আলিঙ্গন খোলা হল, দেখা গেল গোলাপ তার প্রিয়ার জন্য নিজের লাল তাকে দিয়ে দিয়েছে, এবং কাল রঙ নিজের করে  নিয়েছে। গোলাপ তখন বলে, ‘রংটি আমার তোমার হল, শিমুল দেখো ডাকে, বন্ধু আমায় মনে রেখ, রাগে অনুরাগে।’ সেই থেকে কাল গোলাপের উদ্ভব, আর সেই থেকে কৃষ্ণচূড়া লাল। তবে , হিন্দু ধর্ম মতে , কৃষ্ণচূড়া গাছ নাকি শ্রীকৃষ্ণ লাগিয়েছিলেন । হিন্দু দেবতা কৃষ্ণ এই ফুল তার খোপা বা চূড়ায় পড়তো বলে এই ফুলের নাম কৃষ্ণচূড়া আর রাধা যে হলুদ ফুল খোপায় পড়তো তার নাম রাধাচূড়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*